স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ঠাকুরগাঁওয়ের এক পল্লীর শত শত নারী বিধবা হন। তাদের
স্বামীদের পাকসেনারা গুলি করে হত্যা করে। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪০ বছরেও এসব
নারী শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পাননি। পাননি সরকারি
সুযোগ-সুবিধা। এমনকি স্বাধীনতা বা বিজয় দিবসেও কেউ তাদের খবর নেন না। অভাবী
এসব পরিবারের সবাই আজ অনাহারে-অর্ধাহারে দিনযাপন করছেন। বয়সের ভারে অনেকে
ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন। প্রচণ্ড এ শীতে তাদের ভাগ্যে জোটেনি এক টুকরো গরম
কাপড়ও। স্বামীহারা নয়ানী বেওয়ার কথা, 'হামার ভাতার (স্বামী) গ্যালাকগে মারি
ফ্যালাইল, হামারগিলাক ক্যানে ভগবান বাঁচি থুইলগে, হামাকও মারি ফ্যালান। আর
সবার পারছি না'। ঠাকুরগাঁওয়ের বিধবাপল্লী বলে পরিচিত জগন্নাথপুর গ্রামের
সব বিধবারই মনের কথা এটি।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার গ্রাম জগন্নাথপুর। '৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ
চলাকালে ওই গ্রামসহ পাশের আরও ৩ গ্রামের প্রায় ২৫০ জন নারীর স্বামীকে
পাকসেনারা নির্মমভাবে হত্যা করে। সরেজমিন জগন্নাথপুর গ্রামে গিয়ে কথা হয়
স্বামীহারা ওইসব নারীর সঙ্গে। তারা সবাই অভাবী, দিন আনে দিন খায়। তাদের
দেওয়া বর্ণনা মতে, প্রাণে বাঁচতে জগন্নাথপুর, চকহলীদ, সিঙ্গিয়া, চণ্ডিপুর,
আলমপুর, শুকানপুকুর, ঢাবঢুবসহ বহু গ্রামের কয়েক হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু
'৭১ সালের ২৩ এপ্রিল ভারতের উদ্দেশে রওনা দেয়। প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে
জাটিভাঙ্গায় তাদের পথরোধ করে এ দেশীয় কিছু পাকিস্তানি দালাল। ২৪ এপ্রিল
সকালে দুই ট্রাক পাকসেনা চলে আসে জাটিভাঙ্গায়। রাজাকাররা সব পুরুষকে মিছিল
করার কথা বলে নিয়ে যায় জাটিভাঙ্গা মাঠে। পাক বাহিনী সেখানে লাইন করে
মেশিনগানের গুলিতে হত্যা করে সব পুরুষকে। এর সংখ্যা ছিল দু'সহস্রাধিক।
স্বামীহারা দুঃখিনী বেওয়া বয়সের ভারে এখন ন্যুব্জ। তবে স্মৃতিশক্তি এখনও
প্রখর। তিনি বলেন, 'আর হামার কত বয়স হলে বয়স্ক ভাতা পামো! স্বামীয়ও যুদ্ধে
হারাইছি। কে রাখে হামার খবর'; একইভাবে পবনসরি, পামতি, সুশীলা ও গঠনবালা
বলেন, 'দ্যাখেছেন না বারে হামার গেলার অবস্থা, মইরবার লাগছি। ভাতারগুলাক
(স্বামী) অ্যালা মারি ফেলাইল, হামারগুলাকও মারি ফ্যালাউক। মাইনসে কয়, বয়স
হইলে টাকা পাওয়া যায়, তাহো পাইনো না। আর কতদিন পর হামরা বয়স্ক ভাতা পামো'!
এ ব্যাপারে জেলা সমাজসেবা অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক সাইয়েদা
সুলতানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, নিয়মানুযায়ী যাদের বয়স্ক ভাতা
দেওয়া প্রয়োজন তাদের দেওয়া হয়েছে। তবে যুদ্ধকালে পাকবাহিনীর হাতে নিহতদের
বয়স্ক স্ত্রীরা এ ভাতা পেয়েছেন কি-না তা তিনি বলতে পারেননি। আর তাদের বিশেষ
সুবিধা দেওয়ার ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই বলেও জানান তিনি। জগন্নাথপুর
ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান লিটন বলেন, চলতি শীতে তাদের (বিধবা)
কাউকে শীতবস্ত্র দেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্বামীহারা এসব নারীর ব্যাপারে বলা হচ্ছে, তাদের স্বামীরা যুদ্ধ করতে গিয়ে
শহীদ বা নিহত হননি, তাই তারা শহীদ পরিবারের সদস্য হবেন কি-না তা নিয়ে
প্রশ্ন আছে। এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জীতেন্দ্রনাথ
রায় বলেন, তারা শহীদ পরিবারের সদস্য হবেন কি-না এ বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে
সংশিল্গষ্ট মন্ত্রণালয়ে লেখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ ছাড়া বিধবাদের পুনর্বাসনের জন্য জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের পক্ষ থেকে
দাবি জানানো হয়েছে। ঠাকুরগাঁও নাগরিক কমিটির সভাপতি ডা. শেখ ফরিদ আহমেদ
তাদের সংগঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে স্বামীহারা
এসব নারী একত্র হয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে তাদের সাহায্যের জন্য স্মারকলিপি
দেন। ডা. ফরিদ জানান, দীর্ঘ ৪০ বছরে কেবল একবার ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির
পক্ষ থেকে তাদের সামান্য কিছু অর্থ সাহায্য দেওয়া হয়েছিল।
No comments:
Post a Comment