কামারপাড়া গ্রামের দেখাদেখি আশেপাশে আরো ৩০টি গ্রাম এখন এই বিষমুক্ত সবজি
আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়েছে। গ্রামের মহিলারা গনসচেতনতা সৃষ্টি করতে বাড়ি
বাড়ি গিয়ে রায়াসনিক সারের এবং কীটনাশকের খারাপ দিকগুলো তুলে ধরছেন। সবাইকে
সচেতন করছেন।
এলাকার কৃষকরা জানান, দেড় বছর আগে এই গ্রামের আরেক কৃষক
সাইদুর রহমানের চোখ নষ্ট হয়ে যায় কীটনাশক স্প্রে করার কারণে। মূলত এরপর
থেকে তিনি এ ব্যাপারে সচেতনতার কাজ শুরু করেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর মোঃ
রোস্তম আলী এই কাজে তাদের সহযোগিতা করেন। আগে যখন কৃষকরা এ ব্যাপারটি
বুঝতোই না, এখন সেখানে সচেতন কৃষকের সংখ্যা দুই শতাধিক। কৃষি
বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ভাড়া নেয়া একটি কক্ষে তারা নিয়মিত বৈঠক করেন।
একে অপরের সাথে পরামর্শ করেন। এরমধ্যে ২০ জন মহিলা কৃষকও রয়েছেন। বিষমুক্ত সবজি চাষ পদ্ধতির চাষীরা জানান, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার
না করে এই পদ্ধতিতে সবজি চাষ করলে খরচ পড়ে তিন ভাগের এক ভাগ। ফলন হয় বেশি।
সবজির চেহারা হয় সতেজ। যার কারণে রাসায়নিক বিষক্রিয়া ছাড়াও যে ভালো ফসল হয়
এটা তারা এলাকার কৃষককে দেখিয়ে দিয়েছে নিজেরা চাষ করে। এখন তাদের দলে যোগ
হয়ে অন্যরা। কামারপাড়া গ্রামটি মরিচ চাষের জন্য বিখ্যাত। মরিচ চাষী সিদ্দিক বার্তা২৪
ডটনেটকে জানান, সাধারণভাবে জমি চাষ থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে রাসায়নিক সার,
কীটনাশক, সেচ থেকে শুরু করে বাজারজাত করা পর্যন্ত একটি জমিতে ধাপে ধাপে খরচ
হয় সাড়ে ৬ হাজার টাকা। এই জমি থেকে ফলন পাওয়া যায় ৫০ মন মরিচ। ৫০০ টাকা
প্রতি মন দরে বিক্রি করলেও এই মরিচের দাম পড়ে ২৫ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিয়ে
লাভ থাকে সাড়ে ১৮ হাজার টাকা। তিনি জানান, অন্যদিকে অর্গানিক পদ্ধতিতে এই জমিটি চাষ করা হলে খরচ পড়ে তিন
ভাগের এক ভাগ। উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, এই পদ্ধতিতে জমি তৈরির সময় গবর সার
দিতে হয়। এরপর সেচে দেয়ার আগে দিতে হয় ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো ও গবর দিয়ে
তৈরি করা স্থানীয় পদ্ধতির সার) দিতে হয় ১৫ থেকে ২০ কেজি। এরপর পোকা মারার
জন্য তারা ব্যবহার করেন ভেজস ওষুধ। নিমপাতা, বিষকাটালি, পিতরাজ, থনেকুনি,
ধুতুরা, ভেরেন্ডা দিয়ে তারা তৈরি করেন একটি নির্যাস। যা প্রতি লিটার পানিতে
মাত্র ৫০ গ্রাম মিশিয়ে জমিতে স্প্রে করলে ফসলে কোনো পোকামাকড় থাকে না। গাছ
বাঁচে বেশিদিন। ফলন হয় অনেক বেশি। ফসলের চেহারা হয় চকচকে এবং বিষমুক্ত। এই
পদ্ধতিতে ১০ শতাংস জমি চাষে খরচ পড়ে মাত্র দুই হাজার টাকা। ফসল পাওয়া যায়
৫৫ থেকে ৬০ মন। একই ভাবে ৫০০ টাকা মন হিসেবে বিক্রি করে খরচ বাদ দিয়েও
তাদের লাভ হয় ২৮ হাজার টাকা।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর ডা.মোঃ রোস্তম
আলী জানান, বিষমুক্ত সবজি চাষের এই বিপ্লব এখন ছড়িয়ে গেছে
শাহজাহানপুর উপজেলার একাধিক গ্রামে। এই উপজেলার ফুলকোট, বিলকেশপাতা,
জৈন্তবাড়ি, বৃকুষ্টিয়া, বিহিগ্রাম, দহিকান্দি, বড়পাথার, চুপিনগর, বোহাইল,
দুসকুল্লা, মোস্তাইল, হাসুরিয়া, খলিশাকান্দি, দুরুলিয়া, ডেমাজানি, বানরা,
চন্ডিজান, রামেশ্বরপুর, শিবপুর, রামনগর, জোয়ানপুর, রাধানগর, গাড়িদহ ও
সোনাইদিঘী গ্রামের কৃষকরা এখন এই ভেজস পদ্ধতিতে সবজি চাষ করেন। সবজি ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে এই সবজির দাম বেশি না হলেও চাহিদা অনেক
বেশি। হাটে সবজি নেয়া যাবার পরপরই পাইকাড়রা প্রথমে তাদের সবজি কিনে নিয়ে
যায়। বিক্রির জন্য কখনো বসে থাকতে হয় না। তিনি জানান, বিষমুক্ত সবজি চাষে
কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে তারা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে ১০০ কৃষককে দু’টি
করে সিমেন্টের তৈরি রিং দিয়েছেন। এই রিংয়ের মধ্যেই ভার্মি কম্পোস্ট সার
তৈরি করেন তারা। এরপর অনেক কৃষক নিজেরাই বাঁশ দিয়ে তৈরি করা মাচাংয়ে ভার্মি
কম্পোস্ট সার তৈরি করেন। কামারপাড়া গ্রামের মহিলা কৃষকরা জানান, তারা বাড়ির আঙ্গিনায় নিজেরাই ভেজস
পদ্ধতিতে সবজি চাষ করেন। ভেজস রস তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় গাছপালা গ্রামে
অনেক আছে। সেগুলো পাটায় থেতলা করে তারা রস তৈরি করেন। সেই রস বোতলে রেখে
ব্যবহার করা যায় ছয় মাস পর্যন্ত। নিজেরা যেমন বাড়ির আঙ্গিনায় এই পদ্ধতি
তারা ব্যবহার করেন, তেমনি অন্যদেরও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করেন।

No comments:
Post a Comment