দফায় দফায় জ্বালানি তেল, গ্যাস এবং বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধিতে জনজীবনে
দুর্বিষহ অবস্থার সৃষ্টি হবে। অর্থনীতির অস্থিরতা আরও বাড়বে। এমন অভিমত
দিয়েছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশিষ্টজনরা। তারা জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির
পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় কমানোর পরামর্শ
দেন। তাদের অভিমত, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে জ্বালানির দাম
বৃদ্ধির সরকারি যুক্তি সঠিক নয়। বরং গত দেড় বছরে জ্বালানির আমদানি ব্যয়
প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ার কারণেই সরকারকে বারবার দাম বাড়াতে হচ্ছে। এদিকে
জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির পর বাস ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা আসছে আজ শনিবার। গতকাল
শুক্রবার পরিবহন নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া
হয়নি। এদিকে বারবার রাতের আঁধারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণায়
বৈঠকে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন খোদ আওয়ামী লীগ সমর্থক পরিবহন নেতারাই।
যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আমাদের আগে থেকে কিছু না জানিয়েই
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে।
বাড়ছে জ্বালানির দাম, বাড়ছে জনদুর্ভোগ :গত বৃহস্পতিবার রাতে আকস্মিকভাবে সব
ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। এর
আগে চলতি বছরের ৫ মে, ১৮ সেপ্টেম্বর এবং ১০ নভেম্বর তিন দফা ভাড়া বাড়ানো
হয়। গত সাত মাসে এবার চতুর্থবারের মতো জ্বালানির দাম বাড়ল। চলতি মাসেই
বেড়েছে বিদ্যুতের দাম। এ ছাড়া আছে লাগামহীন বাড়ি ভাড়া, বাজারে সকাল-বিকেল
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি। ফলে স্বল্প ও মধ্যআয়ের মানুষকে আগের
চেয়ে বেশি আয় করেও মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া
মানুষের অবস্থা আরও শোচনীয়।
জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় বিআইডিএসের
গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ জায়েদ বখত বলেন, মাস তিনেক আগে জ্বালানির দাম
আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও বর্তমানে পুরোপুরি স্থিতিশীল।
তিনি বলেন, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ হচ্ছে ভাড়াভিত্তিক
বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জ্বালানি তেল আমদানির পরিমাণ আগের চেয়ে প্রায়
দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বাড়তি তেল আমদানি করতে গিয়ে বাজেট ঘাটতি বাড়ছে। এ ছাড়া
বৈদেশিক সাহায্য, রেমিট্যান্স এবং বিদেশি বিনিয়োগ থেকেও আশানুরূপ বৈদেশিক
মুদ্রা আসছে না। ফলে একদিকে বেশি আমদানি, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে
যাওয়ায় ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নও
ঘটছে অনেক বেশি। ১১ দশমিক ৫৮ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির চাপ পুরো অর্থনীতিকে
সংকটজনক করে তুলেছে। অর্থনীতির এই সংকট মোকাবেলার জন্যই বারবার দাম বাড়ছে।
এর পাশাপাশি দাতা সংস্থার চাপও আছে। আইএমএফের কাছ থেকে এক বিলিয়ন ডলারের যে
ঋণ সাহায্য পাওয়ার কথা, তার জন্যও ওই সংস্থার পক্ষ থেকে জ্বালানির মূল্য
সমন্বয়ের চাপ আছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন,
জ্বালানির দাম যেটা বেড়েছে সেটা শতাংশে খুব বেশি নয়। কিন্তু রেওয়াজ হচ্ছে,
জ্বালানির দাম বাড়লে তার সঙ্গে গণপরিবহনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক কিছুর দাম
বাড়বে। দাম বাড়লে জনগণের কষ্ট হবে। অর্থনীতির অবস্থা ভালো হলে জনগণের কষ্ট
বাড়িয়ে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করার কথা নয়।
একটি সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারে
উপদেষ্টা ড.মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া
সরকারের উপায় ছিল না। কারণ এর আগে দুই দফায় দাম বাড়িয়ে যে আয় হয়েছে,
মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকা অবমূল্যায়নের কারণে তার পুরোটাই চলে গেছে।
সংবাদ মাধ্যমে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তৈরি পোশাক মালিকদের শীর্ষ সংগঠন
বিজিএমইএর সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার
কারণে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে, গণপরিবহনের খরচ বাড়বে, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার
ব্যয় বাড়বে, শিল্পে উৎপাদন খরচ বাড়বে। সরকারের সামনে যেমন ভর্তুকি কমাতে
দাম বাড়ানো ছাড়া পথ নেই, আমাদের সামনেও তেমনি সংকট। ইউরোপে অর্থনৈতিক
মন্দার কারণে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়লে আমাদের শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার
ধরে রাখা কষ্ট হবে।
বাস ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আজ : বৃহস্পতিবার গভীর রাতে জ্বালানি তেলের
মূল্য বৃদ্ধির পর গতকাল শুক্রবার পরিবহনের ভাড়া বাড়েনি। শুক্রবার সরেজমিন
ঘুরে কোনো বাসেই বাড়তি ভাড়া নিতে দেখা যায়নি। রাজধানীতে চলাচলরত অধিকাংশ
বাস সিএনজিচালিত। অন্যদিকে বেশিরভাগ দূরপাল্লার বাস চলে ডিজেলে। ফলে একবার
জ্বালানি তেল এবং সিএনজির মূল্য পৃথকভাবে বাড়ানো হলে গণপরিবহনের ভাড়া
বৃদ্ধি নিয়ে সংকটে পড়তে হয় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে। এই সংকট আরও তীব্র হয় আগে
থেকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি অবহিত না
হওয়ার কারণে। গতকাল শুক্রবার সড়ক ভবনে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত
জরুরি বৈঠকে সেই সংকটের কথাই উঠে আসে যোগাযোগমন্ত্রীর কথায়। তিনি বলেন,
'আমি নতুন এসেই তোপের মুখে পড়লাম'। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে আগ
থেকে জানানো হলে সবার সঙ্গে আলোচনা করতে পারতাম। দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত
নিয়ে আমাদের গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জানানো হয়। মন্ত্রী বাস মালিকদের
সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান মূল্যে ভাড়া নেওয়ার আহ্বান জানান। বৈঠকে
আওয়ামী লীগ সমর্থক পরিবহন নেতা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব
খন্দকার এনায়েতুল্লাহ রাতের আঁধারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির
সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেন।
সোহাগ পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ ফারুক তালুকদার সোহেল বলেন, ৫০ লাখ
টাকা দামের বাসের দাম গত ছয় মাসে ৭০ লাখ টাকা হয়েছে। সব কিছুরই দাম
বেড়েছে। তাই শুধু তেলের মূল্য বৃদ্ধি নয়, মোটরযান অধ্যাদেশ-১৯৮৩ অনুযায়ী
সবকিছু হিসাব করেই ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে।
কঞ্জুমার অ্যাসোসিয়েশনের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক কাজী ফারুক বলেন, তেলের
দাম বেড়েছে। আবার ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে কথা হচ্ছে। সব জায়গায়ই সাধারণ জনগণ
উপেক্ষিত। তিনি জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান
জানান।
সভা শেষে বিআরটিসির চেয়ারম্যান আয়ুবুর রহমান খান জানিয়েছেন, আজ শনিবার সকাল
সাড়ে ১০টায় বিআরটিসির অফিসে কস্টিং কমিটির প্রাথমিক মিটিং হবে। বিকেলে সড়ক
ভবনে আলোচনা শেষে ভাড়ার সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
এদিকে আবারও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাপ) সংস্থার সহ-সভাপতি শাহাব উদ্দিন মিলন।
তিনি বলেন, এর আগে আমরা লঞ্চের ভাড়া বাড়াইনি। এখন আর ভাড়া না বাড়িয়ে উপায়
নেই।
বিভিন্ন সংগঠনের ক্ষোভ : জ্বালানি তেলের আকস্মিক মূল্য বৃদ্ধিতে ক্ষোভ
প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সংগঠন। কয়েকটি স্থানে বিভিন্ন সংগঠন বিক্ষোভ মিছিলও
বের করে।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং সাধারণ সম্পাদক
আনিসুর রহমান গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেন, পদ্মা সেতু পিপিপি ভিত্তিতে
নেওয়া প্রকল্পে লাখ লাখ কোটি টাকা দুর্নীতি, অপচয় হচ্ছে। সরকার দুর্নীতির
বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে চরম
দুর্ভোগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জ শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। মিছিল শেষে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের
সামনে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাসদ নেতা মাহবুবুর রহমান, অসিত বরণ বিশ্বাস
প্রমুখ।
সিলেট ব্যুরো জানায়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সিলেট শহরেও বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাসদ।
No comments:
Post a Comment